নন-ক্যাডার ফল প্রকাশের দুই মাস পরও পিএসসিতে আটকে সুপারিশপ্রাপ্তদের ফাইল
সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পরীক্ষা বিসিএস। কিন্তু ৪৪তম বিসিএস যেন পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘসূত্রিতার মূর্ত প্রতীকে। ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর এই বিসিএসের সার্কুলার প্রকাশিত হয়। এরপর দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নন-ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগ কার্যক্রম এখনও আলোর মুখ দেখেনি। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নন-ক্যাডার পদে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায় দুই মাস (৫৬ দিন) অতিক্রান্ত হলেও সুপারিশপ্রাপ্ত ২ হাজার ৯৬৮ জনের ফাইল পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়নি। এই অস্বাভাবিক বিলম্ব হাজারো প্রার্থীর মধ্যে যেমন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, তেমনি প্রশাসনিক অঙ্গনেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
একটি বিসিএসের দীর্ঘ পথপরিক্রমা
৪৪তম বিসিএসের সময়রেখা বিশ্লেষণ করলেই এর জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালের নভেম্বরে ১,৭১০টি পদের বিপরীতে সার্কুলার প্রকাশের পর ২০২২ সালের জুনে প্রকাশিত হয় প্রিলিমিনারি ফলাফল, যাতে উত্তীর্ণ হন ১৫,৭০৮ জন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হতে সময় লাগে প্রায় ১৫ মাস—২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল ১১,৭৩২ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়।
এরপর শুরু হয় মৌখিক পরীক্ষার পালা। প্রথম পর্যায়ের ভাইভা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসে, তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চেয়ারম্যানসহ ১২ সদস্যের পুরো কমিশন পদত্যাগ করলে প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। পরদিনই অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন কমিশনের অধীনে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভাইভা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
ভাইভা শেষে পছন্দক্রম আহ্বান থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে একাধিকবার। ২০২৫ সালের ২ জুন পছন্দক্রম আহ্বানের একদিন পরই বিজ্ঞপ্তিটি স্থগিত করা হয়। পরে তিন দফায় প্রকাশিত হয় চূড়ান্ত ফলাফল—প্রথম দফা ৩০ জুন ২০২৫, দ্বিতীয় দফা ৬ নভেম্বর ২০২৫ এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ সম্পূরক ফলাফল ১১ নভেম্বর ২০২৫। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নন-ক্যাডার পদে পছন্দক্রম আহ্বান করা হয় এবং অবশেষে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ২,৯৬৮ জন প্রার্থীকে নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়।
অন্যান্য বিসিএসের প্রেক্ষিতে বৈষম্য
সুপারিশ প্রকাশের পর ফাইল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পিএসসির স্বাভাবিক গতি কেমন, তা বোঝা যায় বিগত কয়েকটি বিসিএসের তথ্য থেকে। ৪০তম বিসিএসের নন-ক্যাডার সুপারিশের ফাইল ফল প্রকাশের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে যায়, যেখানে সুপারিশকৃত পদের সংখ্যা ছিল ৩,৫৫৭টি। ৪১তম বিসিএসে ৩,১৬৪টি পদের ফাইল পাঠাতে সময় লেগেছিল ৩৫ দিন। ৪৩তম বিসিএসের ৬৪২টি পদের ফাইল যায় ২৬ দিনে। অথচ ৪৪তম বিসিএসের ২,৯৫৮টি পদের ফাইল ফল প্রকাশের ৫৬ দিন পরও পিএসসিতেই আটকে আছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরবর্তী ৪৫তম বিসিএসের নন-ক্যাডার ফাইল ইতোমধ্যে ৩০ দিনের মধ্যে জনপ্রশাসনে প্রেরিত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ৪৪তম বিসিএসের ফাইল আটকে থাকার পেছনে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া দুরূহ।
সিনিয়রিটি জটিলতার আশঙ্কা
এই বিলম্বের একটি গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে সিনিয়রিটি নির্ধারণে জটিলতা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ৪৫তম বিসিএসের নন-ক্যাডার প্রার্থীদের মেডিক্যাল পরীক্ষার তারিখ ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে ৪৪তম বিসিএসের ফাইল এখনও পিএসসির গণ্ডি পেরোতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ৪৫তম বিসিএসের প্রার্থীরা যদি ৪৪তম বিসিএসের প্রার্থীদের আগে যোগদানের সুযোগ পান, তাহলে সিনিয়রিটি নির্ধারণে এক অপ্রত্যাশিত সংঘাতের সৃষ্টি হবে। প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জ্যেষ্ঠতা কাঠামোতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। অথচ এই পুরো সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল শুধুমাত্র সময়মতো ফাইল স্থানান্তরের মাধ্যমে।
মাঠ প্রশাসনে জনবল সংকট ও সেবা ব্যাহত
নন-ক্যাডার কর্মকর্তাগণ উপজেলা, থানা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়োগ কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে সাধারণ জনগণকে নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একজন সাধারণ নাগরিক হয়তো জানেন না কোন বিসিএসের ফাইল কোথায় আটকে আছে, কিন্তু তিনি প্রত্যক্ষভাবে টের পান সেবা প্রদানে ধীরগতি ও জটিলতার যন্ত্রণা।
পিএসসির ভূমিকা ও প্রত্যাশা
পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাদেশের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের ওপর জাতির আস্থা ও প্রত্যাশা সুউচ্চ। একটি নির্দিষ্ট বিসিএসের ফাইল ফল প্রকাশের এত দিন পরও জনপ্রশাসনে প্রেরণ না করা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার পরিচায়ক নয়, এটি প্রার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের অবিচারও বটে। যে তরুণ-তরুণীরা জীবনের পাঁচটি মূল্যবান বছর এই প্রক্রিয়ার পেছনে ব্যয় করেছেন, যাঁদের অনেকের জন্যই বয়সসীমার কারণে এটাই শেষ সুযোগ, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব আরও বেশি সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল।
যৌক্তিক দাবি
আমরা সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—অবিলম্বে ৪৪তম বিসিএসের নন-ক্যাডার সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের ফাইল প্রস্তুত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো বিসিএসের ফাইল স্থানান্তরে একটি সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ ও তা কঠোরভাবে অনুসরণের নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। ফাইল আটকে রাখার এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে প্রার্থীদের মনে পিএসসির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে, যার দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে।
হাজারো তরুণের স্বপ্ন ও শ্রম যেন কেবল ফাইল আটকে থাকার অজুহাতে ম্লান না হয়ে যায়—এটিই এখন সময়ের দাবি।

0 Comments