Latest

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Responsive Advertisement

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও তার বৈশ্বিক গেম চ্যাঞ্জার কূটনীতি


একটা মানু্ষ কতটা অপটিমিস্টিক হতে পারে, তাঁকে না দেখলে বুঝতাম না। কী সরল সোজা আঞ্চলিক ভাষার ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাক্যে বলে ফেললেন; "আমাদের তো সব আছে, আমরা কেন অপরের বোঝা হয়ে থাকব? আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এ রমজানে তো সম্ভব হলোনা, যেন পরেরবারের ঈদ নিজেদের বাড়িতে গিয়ে করতে পারি।"
এই বক্তব্যে কেবল একটি আবেগঘন বক্তব্য নয়, এটি হচ্ছে একটি ওয়ার্ল্ডক্লাস কূটনীতিক কৌশল। কীভাবে? বুঝিয়ে বলছি; আপনার কি মনে হয়, প্রফেসর ইউনুস এমনি এমনি রোহিঙ্গাদের আগামী এক বছরের মধ্যে নিজেদের ভূখন্ডে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের আশাবাদ ব্যক্ত করলেন? মোটেও না। এটাই ছিল কৌশল।

বাংলাদেশ এবং মায়ানমার উভয়ই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। সে হিসেবে তারা জাতিসংঘ ও তার অঙ্গসংগঠন যেমন: "জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার" এর নীতি মেনে চলতে বাধ্য। এ সংগঠনের নীতির মারপ্যাঁচেই তৎকালীন সরকার ২০১৭ সালে ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছিল (অবশ্য সেখানে মানবিকতার বিষয়টিও অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, বলাই বাহুল্য)। কারণ, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের নাগরিক নিজদেশে নির্যাতিত হয়ে প্রাণনাশের আশংকা করে অন্য রাষ্ট্রে আশ্রয় প্রার্থনা করলে সে রাষ্ট্র তাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য। এবং তারা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজদেশে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন করতে সম্মত না হবে, ততক্ষণ আশ্রয়দাতা দেশ তাদের জোরপূর্বক উৎসদেশে পাঠাতে পারবেনা। আমরা নিশ্চয়ই গত কয়েকবছর পত্রপত্রিকায় খেয়াল করেছি; রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতির খবর আমাদের চোখে পড়েনি। কালেভদ্রে জাতিসংঘের দু'একজন দূত ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন, একটা প্রেস ব্রিফিং করতেন আবার এই সংকটের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যেত কালের গহ্বরে। এবার মূল পয়েন্টে আসা যাক; ড. ইউনুস সাহেবের কৌশলের ভিন্নতা কোথায়?


প্রথমত, জাতিসংঘের মহাসচিবকে রোহিঙ্গাক্যাম্প সশরীরে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করানো ছিল একটি অসাধারণ কূটনৈতিক সফলতা, তারুপর এটি ছিল রমজান মাসে। আমরা দেখেছি অ্যান্তেনিও গুতেরেস ধবধবে পাঞ্জাবি গায়ে মিডিয়ার সামনে রোহিঙ্গাদের সামনে ভাষণ দিয়েছেন। এও শুনেশি, তিনি নাকি রোজা রেখেছিলেন মুসলমানদের ধর্মীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে। গুতেরেস ভাষণ দিচ্ছেন, আর জাতিসংঘের সীকৃতিপ্রাপ্ত ১৯৩ দেশের মিডিয়ায় তা একযুগে প্রচার হচ্ছে। কী বার্তা যাচ্ছে? আমরা বেশ কয়েকমাস যাবৎ বিভিন্ন দেশের মিডিয়াগুলোতে একটা অপপ্রচার দেখে দেখে বিরিক্ত হচ্ছিলাম যে; বাংলাদেশে নাকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন বিপন্ন। সুতরাং এহেন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মত বিশ্বে নেতৃত্বদানকারী সংগঠনের প্রধান নির্বাহী (মহাসচিব) এমন একটি দেশে ৪ দিনের সফরে এসেছেন। এটাই ছিল ড. ইউনুসের প্রথম মাস্টারস্ট্রোক। তার উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, এতদিন প্রচারিত সেসব অপতথ্যগুলো ভিত্তিহীন এবং যারা তা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করছিল, গুতেরেসের উপস্থিতি তাদের জন্য ছিল এক কড়া চপোড়াঘাতের ন্যায়। তবে এই সাফল্যের যিনি অন্যতম কারিগর, তিনি হলেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান।

দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রধানতম বাঁধা হলো; তাদের জানমালের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে স্বেচ্ছায় মায়ানমারে ফিরে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ। এক্ষেত্রেই ড. ইউনুস কৌশলী হয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের তাদের আত্মমর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের সেই ভিটেমাটি কেবল একখণ্ড মাটি নয়, সেখানে শুয়ে আছেন তাদের পূর্বপুরুষগণ, এই মহিমান্বিত রমজানে যাদের কবরের কাছে গিয়ে দোয়া-মোনাজাত করতে পারা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। সুতরাং তারা যেন বড়জোর আর একটি বছর অপেক্ষা করে, এর মধ্যে তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা হবে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় করতালিই প্রমাণ করে যে তাঁর বক্তব্য রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফিরে যেতে পুনরায় আশার সঞ্চার করেছে।

তৃতীয়ত, আমরা দেখেছি জাতিসংঘের মহাসচিব পরদিন ঢাকার গুলশানে জাতিসংঘের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় (বাংলাদেশে অবস্থিত জাতিসংঘের কার্যালয়) উদ্বোধন করেছেন। এটিও কিন্তু বর্তমান সরকারের একটি সফলতা বলতে হবে। কারণ, সরকারের উদ্যোগে এই কার্যালয়টি জাতিসংঘের মহাসচিবের উপস্থিতিতে উদ্বোধন হওয়ার অর্থ হচ্ছে, আমাদের পাশে উক্ত সংস্থার উপস্থিতি বৃদ্ধির সম্ভাবনা। যা বাংলাদেশ-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক ও মার্কিন মিত্রদের সাথে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক।

চতুর্থত, জাতিসংঘের মহাসচিব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সাথে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কে নিয়ে একান্ত বৈঠক করেছেন এবং বিবৃতি দিয়েছেন যে তারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে এ সরকারের সকল সংস্কার কার্যক্রমে পাশে থাকবেন। ফলে, কোন রাজনৈতিক দল আর সংস্কারের বিরোধিতা করে কেবল নির্বাচন নির্বাচন করে সেই মুখস্ত প্রলাপ বকতে পারবেনা।

এবার রইলো বাকী রোহিঙ্গা ইস্যুকে আবার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে প্রাসঙ্গিকতা দেওয়া ও সমর্থন আদায় প্রসঙ্গ। আশা করা যায় তা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমাদের কেবল আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। সবকিছু যদি নির্ধারিত পরিকল্পনামাফিক হয় এবং ড. ইউনুস যদি তা করে দেখাতে পারেন, তিনিই হয়ত হতে যাচ্ছেন ২ বার শান্তিতে নোবেল জয়ী বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যক্তি। বাংলাদেশি হিসেবে আমরা অধীর-আগ্রহে সেদিনের অপেক্ষায়।



Post a Comment

2 Comments

  1. দারুন কনটেন্ট

    ReplyDelete
    Replies
    1. অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য 🙂

      Delete

Ad Code

Responsive Advertisement